দক্ষিণ কলকাতার ফুসফুস বলে পরিচিত রবীন্দ্র সরোবরে এবার পরিযায়ী পাখিদের কলতান অনেকটাই ম্লান। শীতের মরশুম আর্ধেক পেরোলেও অন্য বছরের তুলনায় ভিনদেশি অতিথিদের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো কমেছে। পরিবেশবিদ ও পাখিপ্রেমীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। তাঁদের দাবি, লেকের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বড়সড় বদল আসায় পাখিরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
সৌন্দর্যায়নের নামে অবাধে ঝোপঝাড় সাফ করা এবং একাধিক পুরোনো গাছ মরে যাওয়ার ফলে পাখিরা তাদের নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের উৎস হারিয়ে ফেলছে। শহরের ব্যস্ততার মাঝে এক টুকরো সবুজের এই নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে ফাটল ধরায় উদ্বিগ্ন প্রকৃতিপ্রেমীরা। পরিবেশবিদদের মতে, সরোবরের ভেতরে ঝোপঝাড় ও ছোট গাছপালা ছেঁটে ফেলায় বিপাকে পড়েছে পোকা-শিকারী পাখিরা। তাদের আহার ও আশ্রয়ের অভাব দেখা দিয়েছে প্রকটভাবে। এ ছাড়াও লেক চত্বরে মানুষের অতিরিক্ত ভিড় এবং কোলাহল পাখিদের শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। লকডাউনের সময় অর্থাৎ ২০২০ সালে যখন মানুষের আনাগোনা বন্ধ ছিল, তখন পাখির সংখ্যা একলাফে অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এখন সেই চিত্রটা ঠিক তার উল্টো। মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং সরোবরের চরিত্র বদলের প্রভাব সরাসরি পড়ছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। তবে এর মধ্যেই কিছুটা আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাখির সংখ্যা কমলেও এবার বেশ কিছু বিরল ও নতুন প্রজাতির দেখা মিলেছে দক্ষিণ কলকাতার এই জলাশয়ে। চলতি মরশুমে প্রথমবারের মতো রবীন্দ্র সরোবরে দেখা মিলেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘ক্রেস্টেড গোশক’-এর। এটি পাখিপ্রেমীদের কাছে এক বড় পাওনা। এ ছাড়াও ব্ল্যাক-নেপড মোনার্ক, ডার্ক-সাইডেড ফ্লাইক্যাচার এবং ব্লু-ক্যাপড রক থ্রাশের মতো সুন্দর ও দুর্লভ পাখির দেখা পাওয়া গিয়েছে। হরেক প্রজাতির ফিঙে ও কোকিলের ডাকে ভোরে সরোবর মুখরিত হলেও সামগ্রিক সংখ্যাটা আগের মতো নেই। অন্যদিকে, পাখিদের টানে সরোবরে পক্ষীবিদ ও ফটোগ্রাফারদের ভিড় কিন্তু বাড়ছেই। ছুটির দিনে দামি ক্যামেরা ও লেন্স হাতে ভিড় জমাচ্ছেন প্রচুর মানুষ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ছবি তোলায় নেশা সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রবীন্দ্র সরোবরের এই সম্পদ বাঁচাতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন প্রকৃতিবিদেরা। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাঁরা বৃক্ষ রোপণ এবং ছোটদের নিয়ে নেচার-ওয়াক বা প্রকৃতির পাঠ দেওয়ার মতো কর্মসূচি নিচ্ছেন। ঝোপঝাড় না কেটে প্রাকৃতিক জঙ্গল বজায় রাখার আবেদনও জানানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। সৌন্দর্যায়ন যেন কোনোভাবেই পাখিদের ঘরছাড়া না করে, সেদিকে কড়া নজর দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।














