শ্রীনগর-লাদাখ জাতীয় সড়কের ধারে দীর্ঘ বছর পর দেখা হয়েছিল দুই বাল্যবন্ধুর। একজন আব্দুল গনি, অন্যজন তাঁর পুরনো প্রতিবেশী ব্রিজ ‘বাট্টা’ (কাশ্মীরি পণ্ডিত)। চুলে পাক ধরেছে, বয়সের ভারে শরীর নুইয়েছে, তবুও পরিচিত মুখের সেই চেনা দৃষ্টি মুছে যায়নি। দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় পর দুই প্রতিবেশীর এই আবেগঘন আলিঙ্গন কাশ্মীর উপত্যকার এক অন্ধকার ইতিহাসের সাক্ষী ওয়ান্ধামা গ্রামকে ফের খবরের শিরোনামে এনে দিয়েছে।
জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের ‘স্টেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি'(এসআইএ) ১৯৯৮ সালের ২৫ জানুয়ারির সেই নারকীয় ওয়ান্ধামা গণহত্যার তদন্ত নতুন করে শুরু করার পর থেকেই পুরনো স্মৃতি ও আতঙ্কের আবহ নতুন করে ফিরে এসেছে গোটা এলাকায়। ১৯৯৮ সালের ২৫-২৬ জানুয়ারির রাতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরে একদল জঙ্গি গান্ডেরবালের ওয়ান্ধামা গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল। সেই রাতে চার শিশু ও নয়জন নারীসহ ২৩ জন কাশ্মীরি পণ্ডিতকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, যা উপত্যকার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। হামলায় নিহতদের মধ্যে পণ্ডিত পরিবারগুলির পাঁচজন অতিথিও ছিলেন। গোটা ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন কেবল এক কিশোর, যিনি কয়লার গাদায় লুকিয়ে প্রাণ রক্ষা করতে পেরেছিলেন। ঘটনার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় গ্রামের অবশিষ্ট পণ্ডিত পরিবারগুলি ছাড়াও বহু মুসলিম পরিবারও ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মহম্মদ হানিফ বাবা জানান, ওয়ান্ধামায় পণ্ডিতদের সাতটি বাড়ি ছিল, যার মধ্যে তিনটি স্থানীয়রা কিনে নতুন বাড়ি তৈরি করলেও বাকি চারটি ভাঙাচোরা ইঁট-পাথরের বাড়ি আজও স্মৃতি আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সময়ের প্রভাবে বাড়িগুলির দেওয়াল খসে পড়েছে, জানলা-দরজায় গজিয়েছে ঘন জঙ্গল, তবুও সেগুলিতে কেউ হাত দেয়নি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বা ১৯৯৮-এর নারকীয় ঘটনার পর যারা জম্মুতে চলে গিয়েছিলেন, তাঁরা আজও গ্রামে ফেরেন নিজেদের আখরোটের ফলন বিক্রি করতে এবং পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে। যদিও নিরাপত্তার কারণে তাঁরা রাতে গ্রামে থাকেন না। দীর্ঘ ২৮ বছর পেরিয়েও সেই আতঙ্কের স্মৃতি এখনও গ্রামবাসীদের কাঁপালেও, জমি ও পুরনো বন্ধুত্বের অটুট টান ওয়ান্ধামার পণ্ডিত ও মুসলিমদের সম্পর্কের সেতুটিকে আজও ছিন্ন হতে দেয়নি।













