দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি ও বেসরকারি পুঁজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পর অবশেষে ঐতিহ্য ভেঙে বিগ ব্যাশ লিগের (বিবিএল) দরজা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য খুলে দিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ)। ২০২৭-২৮ মরশুম থেকে কার্যকর হতে চলা এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সূচনা হচ্ছে মেলবোর্ন রেনেগেডসের শতভাগ মালিকানা বিক্রির মধ্য দিয়ে। সিএ-র এই পদক্ষেপে বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনীতিতে বড়সড় নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক প্যাট কামিন্স বিষয়টিকে শর্তসাপেক্ষে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সে দেশের ক্রীড়ামহলের একাংশ এর তীব্র বিরোধিতা করছে। তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার এই নীতিবদলে সবচেয়ে বেশি তৎপর হয়ে উঠেছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) ধনী ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলি।
ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল), দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ২০, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আইএলটি২০, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেট (এমএলসি) থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড—বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান টি-টোয়েন্টি লিগেই ইতিমধ্যে নিজস্ব সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট, আরপি-সঞ্জীব গোয়েঙ্কা গ্রুপ এবং জিএমআর/জেএসডব্লিউ-এর মতো ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলি। এতদিন অস্ট্রেলিয়াই ছিল একমাত্র বড় ব্যতিক্রম, যেখানে টুর্নামেন্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল বোর্ডের হাতে। এবার সেখানে প্রবেশের ছাড়পত্র মেলায় আইপিএল দলগুলির সামনে বৈশ্বিক ক্রিকেটারদের সঙ্গে সারা বছরের জন্য বহুমুখী ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তি করার এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হলো।
এর ফলে ক্যামেরন গ্রিন, টিম ডেভিড কিংবা গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের মতো তারকাদের আইপিএল, এসএ২০, এমএলসি এবং বিবিএল—সবকটি আসরেই একই ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্র্যান্ডের ছাতার তলায় খেলানো সম্ভব হবে। জাতীয় দলের চুক্তি ছেড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগকেই পেশা বানানোর যে প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, এই পদক্ষেপ তাতে আরও গতি আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বেসরকারি মালিকানার জন্য বিগ ব্যাশের দরজা খুললেও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া কিন্তু লিগের চাবিকাঠি নিজেদের হাতেই রাখছে। টুর্নামেন্টের আন্তর্জাতিক সূচি নির্ধারণ, খেলোয়াড়দের উপস্থিতি, সম্প্রচার স্বত্ব এবং বেতন পরিকাঠামো বা ‘স্যালারি ক্যাপ’-এর সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবে বোর্ডের হাতেই। পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্রেতাদের অনুমোদন দেওয়া বা বাতিল করার একক ক্ষমতাও নিজেদের কাছেই সংরক্ষণ করছে সিএ। মালিকানার ক্ষেত্রে যাতে কোনো একক শক্তির একাধিপত্য তৈরি না হয় এবং বৈচিত্র বজায় থাকে, সেজন্য ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য দল কেনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩টি ফ্র্যাঞ্চাইজির ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হতে পারে। এখনও পর্যন্ত মেলবোর্ন রেনেগেডসের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক দরপত্র জমা না পড়লেও বাজার বিশেষজ্ঞদের অনুমান, প্রতিটি বিবিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি থেকে ২০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের (১৫০-২০০ মিলিয়ন) কাছাকাছি।
আইপিএল মালিকরা দল কিনলেও বিগ ব্যাশের আসরে এখনই রোহিত শর্মা বা বিরাট কোহলিদের মতো ভারতীয় পুরুষ তারকাদের দেখা যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এখনও তাদের পুরুষ ক্রিকেটারদের বিদেশের কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার ছাড়পত্র দেয় না। ফলে হরমনপ্রীত কৌর বা স্মৃতি মান্ধানারা নিয়মিত ডব্লিউবিবিএল-এ অংশ নিলেও পুরুষদের ক্ষেত্রে সম্প্রচার রাজস্ব বাড়াতে অস্ট্রেলীয় দর্শকদের আগ্রহের ওপরই নির্ভর করতে হবে আয়োজকদের। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগ ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির জন্য বড় কৌশলগত লাভ এনে দেবে।
তারা সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার তৃণমূল স্তর থেকে তরুণ প্রতিভা চিহ্নিত করে নিজেদের বিশ্বব্যাপী অ্যাকাডেমি নেটওয়ার্কে গড়ে তুলতে পারবে। ভবিষ্যতে বিসিসিআই যদি অবসরপ্রাপ্ত বা কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করে, তবে তার সবচেয়ে বড় সুবিধা ঘরে তুলবে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলিই। উল্লেখ্য, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ঘোষণা অনুযায়ী কেবলমাত্র মেলবোর্ন রেনেগেডসের শতভাগ মালিকানাই বিক্রি করা হবে। বাকি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিক্রির কোনো পরিকল্পনা নেই; নিজ নিজ রাজ্য সংস্থার অনুমোদনের ভিত্তিতে দলগুলির সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত অংশীদারি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছাড়া হতে পারে। সব মিলিয়ে বিগ ব্যাশের এই বেসরকারিকরণ বিশ্ব ক্রিকেটে ফ্র্যাঞ্চাইজি সংস্কৃতির আধিপত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার মঞ্চ তৈরি করে দিল।














