১২ জন খনি শ্রমিকের প্রাণসংশয়ী দুর্ঘটনার পরও কি শিক্ষা নেয়নি ইসিএল কর্তৃপক্ষ? একদিকে খনির ভিতরে শ্রমিকদের জীবন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে কোলিয়ারির নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন। অথচ সেই বেহাল পরিস্থিতির ছবি সংবাদমাধ্যমের সামনে উঠে আসতেই সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠল পাণ্ডবেশ্বরের কুমারডিহি এ কোলিয়ারির এজেন্ট ও ম্যানেজারের বিরুদ্ধে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, নিরাপত্তার ঘাটতি আড়াল করতেই কি সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা?
চলতি মাসের ২৬ তারিখ কুমারডিহি এ কোলিয়ারিতে ডুলি বিকল হয়ে খনির গভীরে আটকে পড়েন ১২ জন শ্রমিক। প্রায় ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস উৎকণ্ঠা ও উদ্ধার অভিযানের পর তাঁদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ভয়াবহ এই ঘটনায় কার্যত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন শ্রমিকরা। ঘটনার পরই খনির নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে পৌঁছন ইসিএলের উচ্চপদস্থ আধিকারিক থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্তারা।
এমনকী, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব মাইনস সেফটি (ডিজিএমএস)-এর প্রতিনিধিরাও কোলিয়ারির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ডুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শ্যাফটের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। আপাতত জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাই বিকল্প চাণক ব্যবহার করে খনির নিচে যাতায়াত করছেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে এত তৎপরতা সত্ত্বেও কোলিয়ারির সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে অভিযোগ সামনে আসছে। অভিযোগ, কোলিয়ারির চারপাশ কার্যত অরক্ষিত। প্রধান প্রবেশপথে নেই যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়লা চুরি থেকে লোহা চুরির মতো ঘটনা এখানে হামেশাই ঘটে। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি খনি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে কোলিয়ারির এজেন্ট ও ম্যানেজারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, যেখানে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ নিয়ে অভিযোগ, সেখানে কোলিয়ারির বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ। খনির নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে সাংবাদিকরা ছবি তুলতে গেলে তাঁদের কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকী, তাঁদের প্রবেশ আটকাতে নিরাপত্তারক্ষীদেরও কাজে লাগানো হচ্ছে বলে অভিযোগ। এই বৈষম্যমূলক আচরণ ঘিরেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। বহিরাগতদের প্রবেশে যদি বাধা না থাকে, তবে সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেই এত কড়াকড়ি কেন? যে কোলিয়ারিতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১২ জন শ্রমিকের জীবন চরম বিপন্ন হয়ে পড়েছিল, সেখানে নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র সামনে আসতে দিতে আপত্তি কোথায়? শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বদলে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণেই কি বেশি আগ্রহী কোলিয়ারি কর্তৃপক্ষ?
১২ শ্রমিকের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর কুমারডিহি কোলিয়ারির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগেরও জবাবদিহি চাইছে সংবাদমহল। দুর্ঘটনার পর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এখন দেখার, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসিএল কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর পদক্ষেপ করে, আর সংবাদমাধ্যমের সামনে কোলিয়ারির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার অভিযোগে কী অবস্থান নেয়।














