বাংলার ভোটার তালিকায় ভিন্রাজ্যের লোক ঢোকানোর অভিযোগ তুলে দিল্লির নির্বাচন সদনে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি চিঠি পাঠিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা নন এমন হাজার হাজার মানুষের নাম বিজেপি এজেন্টরা ‘ফর্ম-৬’ জমা দিয়ে তালিকায় তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিহার, হরিয়ানা বা মহারাষ্ট্রের মতো বাংলাতেও একই কৌশলে ভোট লুঠের ছক কষা হচ্ছে বলে চিঠিতে দাবি করেছেন তৃণমূলনেত্রী। জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় কমিশনকে অবিলম্বে নিরপেক্ষ ভূমিকা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনারকে লেখা চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, ‘বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে যে, সিইও অফিস এবং বিভিন্ন জেলায় প্রচুর সংখ্যায় ফর্ম-৬ জমা দিচ্ছেন বিজেপির এজেন্টরা। এটা ভোটার তালিকায় নাম তোলার রুটিন প্রক্রিয়া বলে মনে হচ্ছে না। বরং রাজ্যের বাসিন্দা নন, এমন মানুষদের নাম ভোটার তালিকায় ঢোকানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে।’ মমতার সাফ কথা, এই অভিযোগ সত্যি হলে তা হবে সম্পূর্ণ ‘অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং অগণতান্ত্রিক’ কাজ। তিনি কমিশনকে মনে করিয়ে দেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এর আগে বহু মানুষ চরম হেনস্থার শিকার হয়েছেন। তাঁর দাবি, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কারণে রাজ্যে প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বিজেপিকে কড়া ভাষায় নিশানা করে মমতা চিঠিতে উল্লেখ করেন, একই ধরনের জালিয়াতি এর আগে বিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবং দিল্লির নির্বাচনেও করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই এমন বহিরাগতদের ভিনরাজ্য থেকে ট্রেনে করে নিয়ে এসে ভোট দেওয়ানোর পরিকল্পনা করছে গেরুয়া শিবির।
তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, নির্বাচন কমিশনারের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গের জনগণের গণতান্ত্রিক এবং মৌলিক অধিকারকে খর্ব করছে।’ সুপ্রিম কোর্টের ২০ ফেব্রুয়ারির একটি নির্দেশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি চিঠিতে জানান, নাম তোলা বা সংশোধনের বিষয়টি বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মাধ্যমে হওয়া উচিত। তাঁর দাবি, যেখানে প্রায় ৬০ লক্ষ আবেদন আগে থেকেই ঝুলে রয়েছে, সেখানে নতুন করে ৩০ হাজার আবেদন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ ‘বেআইনি’ এবং তা আদালতের অবমাননা করার নামান্তর।
আইনি প্যাঁচ ও তারিখের গরমিল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি চিঠিতে দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর নতুন করে কোনও আবেদন গ্রহণ করা উচিত নয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ‘২৭ মার্চ’ একটি মেমো জারি করে নাম তোলার সময়সীমা বাড়িয়ে দিয়েছে। মমতার মতে, এই পদক্ষেপ আদতে বিজেপি প্রার্থী ও বহিরাগতদের অনৈতিক সুবিধা করে দেওয়ার একটি গোপন রাস্তা মাত্র। ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ মেনে কমিশন কাজ করলেও তা যেন কোনোভাবেই শীর্ষ আদালতের রায়ের পরিপন্থী না হয়, সেই হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
সোমবার রাতে কলকাতার সিইও দফতরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচমকা হাজিরা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। দফতর থেকে বেরিয়ে অভিষেক সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন, বস্তাভর্তি ফর্ম-৬ নিয়ে বিজেপির লোকজন কমিশনে ঢুকেছে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশের ভোটারদের নাম পিছনের দরজা দিয়ে তালিকায় ঢোকানোর প্রমাণ হিসেবে তিনি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের চ্যালেঞ্জও ছোড়েন। সেই রেশ টেনেই মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার জনসভা থেকে মমতা গর্জে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘এত লোকের নাম বাদ গিয়েছে। সেই নামগুলো এখনও তোলা হল না। আর নতুন করে বিহার, রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকে নাম এনে ঢোকাচ্ছে।’
তাঁর অভিযোগ, বিজেপি বাংলাকে ‘বধ’ করতে চায় বলেই এই কারসাজি শুরু করেছে। তিনি জানান, সোমবার বিকেলে অভিষেকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। মমতা বলেন, ‘আমি বললাম, কী হয়েছে বাবু? বলল দিদি তুমি জানো না ৩০ হাজার ফর্ম জমা দিয়েছে নতুন করে। আমি বললাম সে কী? এখনও পর্যন্ত ১৮ লক্ষ লোকের নাম বাদ গিয়েছে। আরও বাকি আছে। ৪২ লক্ষ ছাড়াও, ৬০ লক্ষের মধ্যে আরও ১৮ লক্ষ নাম তোলা হল না। আর নতুন করে বিহার, রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকে নাম এনে ঢোকাচ্ছে।’ এই বঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সাধারণ মানুষের হয়রানি দেখে তাঁর বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে।
চিঠির শেষ অংশে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তিনি অনুরোধ করেছেন, যাতে অবিলম্বে এই ‘বেআইনি’ প্রক্রিয়া বন্ধ করে বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা হয়। নির্বাচনের মুখে কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং জনমানসে স্বচ্ছতার বার্তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন। রাজ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর থাকায় মমতা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নয়, তৃণমূলের সভানেত্রী হিসেবে দলের প্যাডেই এই চিঠি লিখেছেন।
কমিশনের দরবারে জমা পড়া ওই ‘বস্তা বস্তা’ কাগজ এখন বাংলার রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূলের দাবি, বাংলার মানুষ এই ষড়যন্ত্রের যোগ্য জবাব দেবে। এখন নির্বাচন কমিশন এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক মহল। এই চিঠি যে দিল্লির অলিন্দে বড়সড় কম্পন তৈরি করবে, তা বলাই বাহুল্য। শেষ পর্যন্ত বাংলার ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে কি না, সেটাই এখন দেখার।















