উন্নয়নের ঢাক যতই বাজানো হোক না কেন, বাংলার অর্থনৈতিক কঙ্কালসার চেহারাটা এবার আরও প্রকট হয়ে ধরা দিল। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পাবলিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.০৬ লক্ষ কোটি টাকা। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছিল, তখন যে ঋণের দায় ছিল, গত ১৫ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার গুণ। এই বিপুল ঋণের বোঝা এখন প্রত্যেকটি বাঙালির মাথায় এক অদৃশ্য পাহাড় হয়ে চেপে বসেছে।
সুদ মেটাতেই যাচ্ছে আয়ের বড় অংশ
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে একটি বিশেষ তথ্য— রাজ্যের মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ২০ শতাংশেরও বেশি টাকা চলে যাচ্ছে স্রেফ পুরনো ঋণের সুদ মেটাতে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা শিল্পে বিনিয়োগ হওয়ার বদলে মহাজনী দেনা শোধ করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। রাজ্যের ‘ঋণ ও জিডিপি’র অনুপাত এখন ৩৮.৯ শতাংশ, যা ভারতের বড় রাজ্যগুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি।
মাথাপিছু ঋণের গেরো
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের এই ৭ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা ভাগ করে দিলে প্রত্যেক নাগরিকের মাথায় কয়েক হাজার টাকার দেনা চেপে রয়েছে। একসময় যে বাংলা বিনিয়োগের সেরা ঠিকানা ছিল, আজ সেই রাজ্য দৈনন্দিন খরচ চালাতেও ধারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞ ড. বিধু শেখর ও ড. মিলন কুমারের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, এই ‘ডেবট-ড্রিভেন’ বা ঋণ-নির্ভর শাসন ব্যবস্থা রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কেন এই হাল?
রিপোর্টে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, রাজ্যে বড় শিল্প নেই, নেই নতুন বিনিয়োগ। গত ১৪-১৫ বছরে প্রায় ৬৬০০ কোম্পানি রাজ্য থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে নিজস্ব আয়ের উৎস না বাড়িয়ে কেবল কেন্দ্রীয় অনুদান আর ধারের টাকায় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা অন্যান্য জনমোহিনী প্রকল্প চালানোই এই আর্থিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। পরিকাঠামো উন্নয়নে খরচ জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় নতুন শিল্পও আসতে ভয় পাচ্ছে।
ভোটের মুখে অস্বস্তিতে শাসকদল
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই রিপোর্ট বিরোধীদের হাতে বড় অস্ত্র তুলে দিল। একদিকে যখন শাসকদল উন্নয়নের দাবি করছে, অন্যদিকে ৭ লক্ষ কোটি টাকার এই দেনা সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে— বাংলা কি তবে দেউলিয়া হওয়ার পথে? রাজনৈতিক মহলের মতে, এই অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং ঋণের পাহাড় আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।














