বদলে যাওয়া ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের শক্তি আরও বাড়াতে চাইছে ভারত। এবার লক্ষ্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জমানায় ঢাকার সঙ্গে দিল্লি-ইসলামাবাদ-বেজিংয়ের নতুন রসায়ন নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত সাউথ ব্লক। এই আবহে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়ায় নৌবাহিনীর একটি নতুন ঘাঁটি তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে সবুজ সংকেত দিয়েছে। মূলত জলপথে নজরদারি চালানো এবং প্রয়োজনে দ্রুত প্রত্যাঘাত করার লক্ষ্যেই এই রণসজ্জা সাজাচ্ছে ভারতীয় নৌসেনা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তান ও চিনের ঘনিষ্ঠতা ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের বন্দরে চিনা যুদ্ধজাহাজের আনাগোনা এবং ঢাকার হাতে থাকা চিনা সাবমেরিন ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বায়ুসেনা প্রধানের সাম্প্রতিক পাকিস্তান সফর এবং ইসলামাবাদ থেকে ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা ভারতের উদ্বেগকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নয়াদিল্লি স্পষ্ট জানিয়েছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গোটা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। হলদিয়ার এই নয়া ঘাঁটি সেই নজরদারিরই একটি বড় স্তম্ভ হতে চলেছে। ভৌগোলিক দিক থেকে হলদিয়ার অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কলকাতা বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে হুগলি নদীর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। হলদিয়ায় ঘাঁটি হলে সেই সময় অনেকটাই সাশ্রয় হবে। এই নয়া ঘাঁটিতে শতাধিক অফিসার ও জওয়ান মোতায়েন থাকবেন। এখানে মূলত ১০০ টন ওজনের এবং ৪৫ নটিক্যাল মাইল গতিসম্পন্ন ছোট যুদ্ধজাহাজ রাখা হবে। ফার্স্ট ইন্টারসেপ্টর ক্রাফট এবং নিউ ওয়াটার জেট ফার্স্ট অ্যাটাক ক্রাফটের মতো এই জাহাজগুলি আধুনিক মেশিনগান ও সমরাস্ত্রে সজ্জিত থাকবে। ফলে যে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে বঙ্গোপসাগরের গভীরে দ্রুত অপারেশন চালানো নৌসেনার পক্ষে সহজ হবে।
এখনও পর্যন্ত এই নতুন নৌঘাঁটির নাম চূড়ান্ত হয়নি। জেটি নির্মাণের কাজও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তৎপরতা দেখে স্পষ্ট যে, সুন্দরবন থেকে শুরু করে দীর্ঘ জলসীমানায় কোনও ফাঁক রাখতে চাইছে না ভারত। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ নদীপথের সংযোগ থাকায় অনুপ্রবেশ বা চোরাচালানের পাশাপাশি সামরিক উস্কানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না প্রতিরক্ষা মহল। হলদিয়া থেকে এই অপারেশনাল বেসটি মূলত ‘কুইক রেসপন্স টিম’ হিসেবে কাজ করবে। জলসীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিনা নৌবাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রাখাই হবে এই ঘাঁটির প্রধান কাজ।
আসলে প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতা বদলের পর থেকেই ভারতের প্রতিরক্ষা বলয় নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। একদিকে চিনের খবরদারি এবং অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের মাখামাখি ভারতকে জলপথে আরও শক্তিশালী হতে বাধ্য করছে। হলদিয়ার এই নয়া ঘাঁটি সেই পরিকল্পনারই বাস্তব রূপায়ন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এখানে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগোবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে পূর্ব ভারতের উপকূলে ভারতের নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্ছিদ্র হবে। ফাইল ফটো ।














