Facebook
Twitter
LinkedIn
Threads
X
Email
WhatsApp
Telegram
StumbleUpon
Pinterest
Skype
Pocket

বাংলার বৃহত্তম টাঁকশালের স্মৃতি

বাংলার বৃহত্তম টাঁকশালের স্মৃতি

গঙ্গার পলিতে ঢাকা পড়েছে ইতিহাস। অথচ এক সময় এই মাটির নিচেই স্পন্দিত হতো বাংলার অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। মুর্শিদাবাদের এলাহিগঞ্জে মাটি খুঁড়তে গিয়ে শ্রমিকের কোদালে হঠাৎই বেজে উঠেছিল ধাতব শব্দ। মাটির জালা ভর্তি মোহর দেখে চমকে উঠেছিলেন সকলে। সেই মোহর পরীক্ষার পর রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নিশ্চিত করেছে, এগুলি মুর্শিদাবাদের নিজস্ব টাকশালের তৈরি। উদ্ধার হওয়া সেই পঁয়ষট্টিটি মোহর এখন ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও জগৎশেঠ মানিকচাঁদের হাতে গড়া সেই টাকশালই ছিল এক সময় বাংলার বৃহত্তম মুদ্রা তৈরির কেন্দ্র।

দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ যখন ‘মুকসুদাবাদের’ নাম বদলে ‘মুর্শিদাবাদ’ রাখলেন, তখনই তিনি এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের স্বপ্ন বুনেছিলেন। সহযোগী হিসেবে পেয়েছিলেন ধুরন্ধর ব্যবসায়ী মানিকচাঁদকে। সুদূর পাটনা বা ঢাকা থেকে মুদ্রা আনিয়ে ব্যবসা চালানো ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। সেই সমস্যা মেটাতেই জন্ম নিল মুর্শিদাবাদের এই ঐতিহাসিক টাকশাল। মূলত মানিকচাঁদের কুঠির বিপরীত দিকে গঙ্গার তীরেই এটি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। কালক্রমে মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় আলমগীর ও দ্বিতীয় শাহ আলমের নামাঙ্কিত মুদ্রাও এই কারখানায় তৈরি হয়েছে।

তবে টাকশালের সঠিক অবস্থান নিয়ে আজও গবেষকদের মধ্যে বিতর্কের শেষ নেই। কারো মতে এটি ছিল ইচ্ছাগঞ্জের বিপরীতে, পরে যা ইমামবাড়ার কাছে সরে আসে। বর্তমান ইমামবাড়ার সামনের ঘাটটির নাম আজও ‘মিন্টঘাট’, যা সেই ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে। আবার একাংশের দাবি, যেহেতু টাকশাল দেখভালের ভার ছিল জগৎশেঠদের ওপর, তাই কারখানাটি ছিল তাঁদের বাড়ির ঠিক পাশেই। কিন্তু গঙ্গার করাল গ্রাসে জগৎশেঠদের সেই বসতবাড়ির সঙ্গেই হারিয়ে গিয়েছে বাংলার বৃহত্তম টাকশালের অস্তিত্ব।

নবাবী আমলে সোনা-রুপোর একচেটিয়া কারবারী ছিলেন জগৎশেঠরা। যে কেউ সোনা বা রুপো নিয়ে এই টাকশালে গেলে নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে মোহর তৈরি করে নিতে পারত। এই কমিশন ভাগ হতো নবাব ও শেঠদের মধ্যে। ইংরেজ, ফরাসি বা ডাচ বণিকরাও বাধ্য হতেন এই দেশি টাকশালের দ্বারস্থ হতে। ১৭২৫ সালের এক হিসেবে দেখা যায়, শুধু টাকশালের কমিশন বাবদ নবাবের কোষাগারে জমা পড়েছিল ছয় লক্ষ টাকা। লভ্যাংশের নিরিখে এটি ছিল তৎকালীন ভারতের অন্যতম সফল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

মুর্শিদাবাদের এই টাকশালের মুদ্রা চেনার এক অমোঘ বৈশিষ্ট্য ছিল ‘যুঁইফুল’ ছাপ। বাদশা ঔরঙ্গজেবের নামাঙ্কিত এই টাকশালের মুদ্রা আজও সংরক্ষিত আছে পাকিস্তানের লাহোর মিউজিয়ামে। দ্বিতীয় শাহ আলমের রাজত্বের বিশেষ বছরগুলিতে যে মুদ্রাগুলি বের হতো, তার এক পিঠে থাকত ফার্সি হরফে বাদশার নাম এবং অন্য পিঠে লেখা থাকত ‘জবরে মুর্শিদাবাদ’ বা ‘জলুষ ১৯’। এই নিখুঁত ছাঁচ ও শৈলী দেশি মুদ্রাশিল্পের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে বাংলার রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তরিত হলে এই টাকশালের গুরুত্ব কমতে শুরু করে। মজার বিষয় হলো, কোম্পানি যখন কলকাতায় নিজস্ব টাকশাল গড়ল, তখনও তারা দীর্ঘকাল ধরে মুর্শিদাবাদের নাম ও বিখ্যাত যুঁইফুল প্রতীক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল মুদ্রার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে। মানিকচাঁদের পর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র রঘুনন্দন এই টাকশালের দায়িত্ব সামলেছিলেন। প্রায় এক শতাব্দীকাল ধরে সগৌরবে চলার পর অবশেষে আধুনিকতার চাপে ও নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় বাংলার এই শ্রেষ্ঠ টাকশাল। আজ মাটির ঢিপি আর ভাঙা কলসিতেই আটকে আছে সেই স্বর্ণযুগের ইতিহাস। ফটো সোশ্যাল মিডিয়া ।

READ MORE.....