বিশ্ব মঞ্চে বদনাম হল বাংলা । মেসির শো-এ তুমুল বিশৃঙ্খলা যুবভারতীতে। লিয়োনেল মেসির সংক্ষিপ্ত সফর কলকাতায় পরিণত হল অরাজকতায়। হাজারো ভক্তের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। স্টেডিয়াম লণ্ডভণ্ড। পুলিশ র্যাফ নামিয়েছে। গ্রেপ্তার মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত । মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্সে পোস্ট করেছেন,সল্টলেক স্টেডিয়ামে শনিবার যে অব্যবস্থা দেখা গেল,তাতে আমি বিচলিত এবং স্তম্ভিত। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্য আমি লিয়োনেল মেসি, সকল ক্রীড়াপ্রেমী এবং তাঁর ভক্তদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
যুবভারতীতে বিশ্বজয়ী তারকা লিয়োনেল মেসিকে নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠান ঘিরে শনিবার সকালে এক চরম অব্যবস্থা দেখা যায়। হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও ভক্তরা এক ঝলক দেখতে পাননি তাঁদের প্রিয় তারকাকে। এই বঞ্চনা থেকেই জন্ম নিয়েছে তীব্র ক্ষোভের। জানা গেছে,টিকিটের দাম চার হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। হাজারো টাকা খরচ করে অনেকে এসেছিলেন। পুরুলিয়া, কাঁথি, বেঙ্গালুরু, শিলং, নেপাল থেকেও ভক্তরা। কিন্তু মেসির এক ঝলকও দেখেননি। এদিন সকাল ১১.৩০ মিনিট নাগাদ মেসি তাঁর সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ় এবং রদ্রিগো ডি’পলকে নিয়ে যুবভারতীতে প্রবেশ করেন।
কিন্তু গাড়ি থেকে নামার পর থেকেই তাঁকে ঘিরে ধরেন বেশ কিছু ভিআইপি, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, এবং নিরাপত্তারক্ষীরা। মেসি এমনিতেই ছোটখাটো চেহারার । এই ভিড়ের কারণে গ্যালারি থেকে তাঁকে দেখাই যায়নি। পরিস্থিতি সামলাতে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং প্রধান আয়োজক শতদ্রু দত্তকে মাইক্রোফোনে ঘোষণা করতে হয়। তাতেও অবশ্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। পরিস্থিতি এমন গুরুতর আকার নিল যে নির্ধারিত সময়ের আগেই মাঠ ছাড়লেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক । ফলে দর্শকদের মধ্যে দ্রুত অসন্তোষ ছড়াতে শুরু করে। ক্ষুব্ধ ফুটবলপ্রেমীরা ‘উই ওয়ান্ট মেসি’ স্লোগান দিতে শুরু করেন।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীও। বিশৃঙ্খলার খবর পেয়ে তাঁকে মাঝপথ থেকেই গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যেতে হয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পোস্টে এই ঘটনার জন্য স্তম্ভিত ও বিচলিত বলে জানিয়েছেন এবং মেসি ও সকল ক্রীড়াপ্রেমীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এর পরেই তিনি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা ঘোষণা করেন। এই কমিটি বিশদ অনুসন্ধান চালাবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন না ঘটে, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করবে। যুবভারতীতে মেসি মাত্র ১৬ থেকে ১৮ মিনিট ছিলেন বলে জানা গেছে। দর্শকদের ক্ষোভের আঁচ পেয়েই তাঁকে তড়িঘড়ি মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অনেকে মনে করছেন।
মেসি মাঠ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় চরম তাণ্ডব। ক্ষিপ্ত জনতা ফেন্সিং ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়ে। প্রায় দু-আড়াই হাজার মানুষ মাঠে ঢুকে লণ্ডভণ্ড করে দেন। গোল পোস্টের জাল ছিঁড়ে ফেলা হয়, সাজঘরে যাওয়ার টানেলের ছাউনি ভেঙে দেওয়া হয়। দর্শকাসন থেকে মাঠে বোতল এবং ভাঙা চেয়ার ছোঁড়া হয়। মাঠে আগুন ধরানোরও চেষ্টা হয়েছিল। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশকে লাঠি চালাতে হয় এবং নামাতে হয় র্যাফ। স্টেডিয়ামের বাইরেও উত্তেজনা ছড়ায়। এই ঘটনার পর কলকাতার ভাবমূর্তি বিশ্ব দরবারে ক্ষুণ্ণ হলো। হাজার হাজার টাকা, যা কেউ কেউ তাদের কয়েক বছরের সঞ্চয় ভেঙে দিয়েছিলেন, সেই টিকিটের টাকা দিয়েও দর্শক শূন্য হাতে ফিরলেন।
সবচেয়ে সস্তার টিকিটের দামও ছিল চার হাজার টাকার বেশি। দর্শকদের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে বিরাট দুর্নীতি হয়েছে। তাঁরা টিকিটের টাকা ফেরত দাবি করেছেন। ক্ষোভের নিশানায় ছিলেন অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত। পরিস্থিতি এমনই ছিল যে, কিছু দর্শক তাঁকে সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেনের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। মেসিকে ঘিরে থাকা ভিআইপিদের আচরণও ছিল সমালোচনার কেন্দ্রে।
ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মোহনবাগান কর্তা সৃঞ্জয় বসু সহ বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি মেসিকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিলেন যে, সাধারণ দর্শক তাঁকে দেখতেই পাননি। অরূপ বিশ্বাসকে অনেকে ১৫ মিনিট ধরে কার্যত মেসির বাহুলগ্ন হয়ে থাকতে দেখেছেন। তাঁরা নিজস্বী তুলেছেন, সই নিয়েছেন। দর্শক গ্যালারি থেকে চিৎকার করে প্রশ্ন তুলেছেন, অরূপ কি নিজের বাড়িতে ব্যক্তিগত অতিথি নিয়ে এসেছেন? মেসিকে এ ভাবে জড়িয়ে আছেন কেন? টলিউডের প্রতিনিধি হিসাবে শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ও মেসির সঙ্গে ছবি তুলেছেন, যা সমাজমাধ্যমে সমালোচিত হয়েছে। মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে পরে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার জানিয়েছেন, শতদ্রু লিখিত মুচলেকা দিয়েছেন যে, দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। পরে এডিজি জাভেদ শামিম শতদ্রুর গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ডিজি জানান, অনেক দর্শকই ভেবেছিলেন মেসি হয়তো মাঠে খেলবেন। কিন্তু মেসি যতটা সময় মাঠে ছিলেন, সেটাও কম মনে হয়েছে অনেকের। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতাকেও দায়ী করেছেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস নিশানা নেন মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশের।
দায় পুলিশ প্রশাসনের। রাজ্যপাল দাবি করেন, আগে থেকেই ভিড় নিয়ে তিনি প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি এই ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং আয়োজকদের কড়া শাস্তি ও দর্শকদের সব টাকা ফেরতের দাবি করেছেন। অপরদিকে, ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানান, সরকার যেহেতু তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, তাই তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। বিরোধীরা, বিশেষ করে সিপিএম, অরূপ বিশ্বাসকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং শাহরুখ খানের মতো তারকাদের উপস্থিতির বিজ্ঞাপন দিয়ে যে মেসিময় উন্মাদনা তৈরি করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ধোঁকা প্রমাণিত হল। আয়োজনের ত্রুটি, পরিকল্পনার অভাব এবং ভিআইপিদের অতি-উৎসাহের কারণেই যুবভারতীতে এমন চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ২০১১ সালে মেসির কলকাতা সফরে এমন বাড়াবাড়ি দেখা যায়নি বলে অনেকে স্মৃতিচারণ করেছেন। সেই তুলনায়, শনিবারের ‘যুবভারতী কেলেঙ্কারি’ বিশ্ব দরবারে বাংলার মাথা হেঁট করে দিল। মেসি যদিও এসব থেকে অনেক দূরে, তাঁর ঝটিকা সফর শেষ করে বিমান হায়দরাবাদের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে।














